চিকুনগুনিয়া-জ্বর-সারে-রেখে-যায়-ভোগান্তি

আমাতন বিবির (৫০) চিকুনগুনিয়া জ্বর ভালো হয়েছে দেড় মাস। কিন্তু এখন চিকুনগুনিয়া-পরবর্তী সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর ভাষায়, ‘গিডে গিডে ব্যতা, শির শির করে। হাঁটতে পারি না। নামাজ পড়তে পারি না। শরীলডাও দুব্বল লাগে।’ তিনি ছেলের সঙ্গে রাজধানীর ধোলাইখাল থেকে চিকিৎসা নিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস ক্লিনিকে এসেছিলেন। সেখানেই গত সোমবার তাঁর সঙ্গে কথা হয়।
সেগুনবাগিচার রাইসুল ইসলামও (৩৭) একই সমস্যা নিয়ে আর্থ্রাইটিস ক্লিনিকে এসেছিলেন। তাঁর চিকুনগুনিয়া হয়েছিল গত জুনের মাঝামাঝি। জ্বর ছিল দিন পাঁচেক। কিন্তু এখনো ঘুম থেকে ওঠার পরে হাঁটতে পারেন না। গিঁটে তীব্র ব্যথা। আঙুল মুঠো করতে পারেন না। মোটরসাইকেলে কিক দিতে পারেন না। শুধু আমাতন বিবি বা রাইসুল ইসলাম নয়, চিকুনগুনিয়া-পরবর্তী সমস্যা নিয়ে এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১১ জন রোগী চিকিৎসা নেন। আরও অনেকে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ ছিলেন।
চিকিৎসকেরা জানান, চিকুনগুনিয়া জ্বর সাধারণত তিন থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। কিছু ক্ষেত্রে এটা ১০ দিনও হতে পারে। রোগটি এমনি এমনিও ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে চিকিৎসক ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মূল ভোগান্তি শুরু হয় জ্বর সারার পরে। শরীরে বিশেষ করে গিরায় তীব্র ব্যথাসহ হাঁটাচলা বা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না। এতে জুতার ফিতা বাঁধা এমনকি দাঁত ব্রাশ করাটাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি ফোলা থাকতে পারে। অস্থিসন্ধির উপসর্গ তীব্র গিরা ব্যথা হতে সমান্ত্রীয় পলিথারটিসও হতে পারে। এর ফলে স্থায়ী গিরা ব্যথা এবং গিরা শক্ত হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরবর্তী সময়ে কোনো না কোনো ধরনের আর্থ্রাইটিস বা গেঁটেবাতের ব্যথায় ভোগেন। এসব রোগীর উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে বিএসএমএমইউতে রিউম্যাটোলজি বিভাগ গত ১৩ আগস্ট চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস ক্লিনিকটি চালু করে। হাসপাতালটির বহির্বিভাগের ১ নম্বর ভবনের ৪১০ নম্বর কক্ষে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত সেবা দেওয়া হয়। এ রকম বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগও চালু করেছে। বিএসএমএমইউর ক্লিনিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফারজানা সুমি বলেন, তুলনামূলকভাবে বয়স্ক রোগীরা আর্থ্রাইটিসে বেশি ভুগছেন।
দুটি হাসপাতালই চিকুনগুনিয়া-পরবর্তী আর্থ্রাইটিসের ধরন এবং ফলাফল জানতে চিকিৎসা নিতে রোগীদের তথ্য রাখছে। ফারজানা সুমি বলেন, এখানে আসা রোগীদের বেশির ভাগই দুই থেকে আড়াই মাস আগে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সদ্য চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীও আসছেন। তার মানে, মানুষ এখনো চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত এক সেমিনারে বিএসএমএমইউর রিউমেটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যু হতেই পারে না, এটি ভুল ধারণা। প্রতি ১০ হাজারে একজন রোগী মারা যেতে পারেন। শিশু, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ও গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা বেশি হতে পারে। ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগে ভুগছেন এমন মানুষেরাও চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন। তাই মৃত্যু হবে না ভেবে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। জটিলতাগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণ, জন্ডিস, ঝাপসা দেখা, বুক ধড়ফড়, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের লক্ষণগুলো থাকলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন তিনি।
চিকিৎসকেরা বলেছেন, প্রচুর পানি বা তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি বিশ্রাম নিতে হবে। চিকুনগুনিয়া-পরবর্তী আর্থ্রাইটিসের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা চলবে। ওষুধ খেতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
ফারজানা সুমি বলেন, চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক খাবারদাবার খাবেন। অনেক সময় বরফ বা গরম পানির সেঁক ব্যথা প্রশমিত করে। এ ছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি কাজে দেয়। তবে এসব পরামর্শ অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিতে হবে। এর পাশাপাশি, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকুনগুনিয়া-পরবর্তী উদ্বিগ্নতা বা বিষণ্নতায় ভুগতে পারে। এ ধরনের রোগীদের সাইকোথেরাপি নিতে হতে পারে।

মুসলিমা জাহান
২৬ আগস্ট ২০১৭, ০১:১৫; প্রথম আলো